২৩ জুলাই, ২০২৪

নিষিদ্ধ পলিথিন ৮০% মানুষের হাতে


দেশের সব নদ-নদী থেকে বছরে সর্বসাকল্যে মাছ আসে প্রায় দুই লাখ টন। সেই হিসাবে দিনে এসব নদী থেকে ৫৪৭ টন মাছ ধরা হয়। এই হিসাব মৎস্য অধিদপ্তরের।

কিন্তু বিশ্বব্যাংকের করা এক জরিপে দেখা গেছে, দেশের তিন প্রধান নদী পদ্মা, মেঘনা ও যমুনায় দিনে ৭৩ হাজার টন প্লাস্টিক ও পলিথিন পড়ে। পলিথিন পড়ার দিক থেকে ওই নদী অববাহিকা এখন দ্বিতীয় অবস্থানে। নগর পেরিয়ে প্লাস্টিক-পলিথিন ছাড়িয়ে পড়েছে দুর্গম গ্রাম ও জনপদে।

দেশে পলিথিন ব্যাগ উৎপাদন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করে আইন আছে। তবু দেশের ৮০ শতাংশ মানুষ প্রতিদিন পলিথিন ও প্লাস্টিক সামগ্রী ব্যবহার করছে।

সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, প্লাস্টিক মাটি ও পানির ক্ষতি করে মানুষের বিপদ ডেকে আনছে। এসব প্লাস্টিকের সঙ্গে নানা বিষাক্ত রাসায়নিক থাকছে। এসব রাসায়নিক ব্যবহারের পর মাটির সঙ্গে, পোড়ানোর পর বাতাসের সঙ্গে এবং খাদ্যপণ্যের সঙ্গে মানুষের শরীরে ঢুকছে। উচ্চ রক্তচাপ থেকে শুরু করে ক্যানসারের মতো রোগ ছড়াচ্ছে।
 

দেশের প্লাস্টিক ও পলিথিন মূলত মাটি ও নদীতে গিয়ে জমা হচ্ছে।                                                                                                                                                                                                          দীর্ঘ মেয়াদে এখানে কী পরিমাণে প্লাস্টিক জমা হয়েছে,                                                                                                                                                                                                                            তা চিহ্নিত করে অপসারণ করতে হবে। নয়তো এ দেশের মাটি ও পানি স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে যাবে।                                                                                                                                                            এখানে ফসল ফলানো ও মাছ চাষ কঠিন হয়ে যাবে।

সাইফুল ইসলাম, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্যা ও পানি ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক


বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ভিয়েতনামের ডানাং বিশ্ববিদ্যালয়, অস্ট্রেলিয়ার আরএমআইটি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে যৌথভাবে একটি গবেষণা চালিয়েছে।

এতে প্লাস্টিক দূষণের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। ‘বাংলাদেশের প্লাস্টিক দূষণের বর্তমান চিত্র এবং চ্যালেঞ্জ: কৃষিজমি এবং স্থানীয় প্রতিবেশ ব্যবস্থায় প্রভাব’ শীর্ষক গবেষণাটি ফ্রন্টিয়ার্স অব এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং নামক জার্নালে সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্যা ও পানি ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, দেশের প্লাস্টিক ও পলিথিন মূলত মাটি ও নদীতে গিয়ে জমা হচ্ছে। দীর্ঘ মেয়াদে এখানে কী পরিমাণে প্লাস্টিক জমা হয়েছে, তা চিহ্নিত করে অপসারণ করতে হবে। নয়তো এ দেশের মাটি ও পানি স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে যাবে। এখানে ফসল ফলানো ও মাছ চাষ কঠিন হয়ে যাবে।

প্লাস্টিকের উৎপাদন ও ব্যবহারের ধরন
বাংলাদেশে প্লাস্টিকের উৎপাদন ও ব্যবহারের ধরন নিয়ে গবেষণায় বিস্তারিত উঠে এসেছে। এতে বলা হয়, বাংলাদেশে প্রায় তিন হাজার কারখানায় প্লাস্টিক ও পলিথিন তৈরি হয়। এসব কারখানায় দিনে ১ কোটি ৪০ লাখ পলিথিন ব্যাগ উৎপাদিত হয়। বেশির ভাগ কারখানা মাঝারি ও ছোট আকারের। অধিকাংশ কারখানা ঢাকা ও চট্টগ্রামে। এসব কারখানার উৎপাদন ব্যবস্থাপনা দুর্বল। ফলে দূষণ তৈরি করে বেশি। প্লাস্টিক দূষণে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ।

গবেষণায় বিশ্বব্যাংকের একটি গবেষণার কথা উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়েছে, দেশের প্রধান প্রধান নদ-নদীর বর্জ্য পরে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়ে। এতে সাগরের জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে। শুধু ঢাকার চারপাশের নদীগুলোতে জরিপ চালিয়ে ৩০ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য পাওয়া গেছে। ওই বর্জ্য গত কয়েক যুগে জমা হয়েছে।

এ ব্যাপারে গবেষণা সংস্থা ক্যাপসের নির্বাহী পরিচালক কামরুজ্জামান মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্লাস্টিক একই সঙ্গে আমাদের বায়ু ও পানিকে দূষিত করছে। খাদ্যচক্রের মাধ্যমে তা আমাদের শরীরে ঢুকছে। এভাবে চলতে থাকলে আমরা একটি অসুস্থ প্রজন্ম রেখে যাব।’

মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা দুর্বল
গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০০২ সালে বিশ্বে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে পলিথিনের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু আইনের দুর্বল প্রয়োগের কারণে দেশের ৮০ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে প্রতিদিন পলিথিন ও প্লাস্টিক সামগ্রী ব্যবহার করছে। দেশে কোভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়ার পর ২০২০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ১৪ হাজার ৫০০ টন প্লাস্টিক বর্জ্য বেড়ে যায়, যা মূলত চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য খাতের বর্জ্য।

শুধু ঢাকায় দিনে ২০০ টন প্লাস্টিক জাতীয় মেডিকেল বর্জ্য তৈরি হয়। হাতে গোনা কয়েকটি হাসপাতাল ছাড়া সবাই তাদের বর্জ্য অপরিকল্পিতভাবে ফেলে দেয়। এ ধরনের বর্জ্যের সঙ্গে নানা ওষুধ এবং রাসায়নিক সামগ্রী নদী ও সাগরের পানিতে মিশে পরিবেশকে মারাত্মকভাবে দূষিত করে তুলছে।

হাসপাতালের বর্জ্য থেকে হেপাটাইটিস, নিউমোনিয়া, গ্যাংগ্রিন ও টাইফয়েডের মতো রোগ দ্রুত ছড়ায়। শুধু ঢাকা শহরে দিনে ২০৬ টন মেডিকেল বর্জ্য তৈরি হয়। কোভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়ার পর এ ধরনের বর্জ্যের পরিমাণ ৪০ শতাংশ বেড়েছে।

ইলেকট্রনিক বর্জ্য
দেশে ইলেকট্রনিক সামগ্রীর বেশির ভাগ প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি হচ্ছে। দ্রুত নষ্ট হওয়ার কারণে এসব পণ্য ভোক্তারা ফেলে দিচ্ছেন, ফলে তা বর্জ্যে পরিণত হচ্ছে। এসব পণ্যে বেশ কিছু মারাত্মক দূষণকারী ও বিপজ্জনক উপাদান পাওয়া যাচ্ছে। দেশের সাত হাজার শিল্পকারখানা তাদের অপরিশোধিত বর্জ্য নদ-নদীতে ফেলছে। এসব বর্জ্যের মধ্যে নানা ক্ষতিকর রাসায়নিক থাকে। একই সঙ্গে প্রতিদিন দেশে কয়েক হাজার গাড়ির টায়ার পোড়ানো হয়। এসব টায়ারের মধ্যে রাবার ছাড়াও প্লাস্টিক মেশানো থাকে। ফলে তা পোড়ানোর মাধ্যমে অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা বাতাসে মিশে যাচ্ছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে দেশের ১ হাজার ১৭৬টি শিল্পকারখানাকে মারাত্মক দূষণকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব বর্জ্যের বড় অংশ বুড়িগঙ্গা, বালু ও তুরাগে গিয়ে পড়ে।

দেশের কৃষিকাজেও প্লাস্টিক ও পলিথিনের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। সবজি, বিভিন্ন ফসল ও ফলের বীজ মূলত পলিথিনের ব্যাগে রাখা হচ্ছে। এ ছাড়া প্লাস্টিকের টিউব ও পানির ট্যাংকের ব্যবহারও আগের চেয়ে বেড়েছে। ফসলের জমিতে সম্প্রতি মালচিং পদ্ধতি চাষাবাদ বাড়ছে। বর্তমানে দেশের ১ কোটি ২০ লাখ হেক্টর জমিতে ওই পদ্ধতিতে চাষ হচ্ছে। মোটা প্লাস্টিকের পাইপের মধ্যে বীজ রেখে ওই চাষাবাদ করা হয়। আর রোদবৃষ্টিতে ওই প্লাস্টিক কণা মাটি ও পানির সঙ্গে মিশে যায়, যা দীর্ঘ মেয়াদে মাটি ও পানির ক্ষতি করছে।
 

author

নিউজ ডেস্ক (৪৮)